সাভারে ছয়টি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন আটক মশিউর রহমান সম্রাট, যার প্রকৃত নাম সবুজ শেখ। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেছেন যে, নৈতিকতা-বিরোধী যৌনাচারে লিপ্ত ভবঘুরেদের তিনি ‘থার্টিটি ফোর’ বা ‘সানডে মানডে ক্লোজ’ করে দিতেন, যা তার ব্যবহৃত হত্যাকাণ্ড বোঝানোর সাংকেতিক শব্দ। সাভার মডেল থানা পুলিশ তার আসল পরিচয় নিশ্চিত করেছে।
সাভার থানার পরিদর্শক (অপারেশন) হেলাল উদ্দিনের ভাষ্যমতে, সম্রাট মানসিক ভারসাম্যহীন নন, বরং অতিরিক্ত মাদক সেবনের কারণে তার মধ্যে কিছুটা মানসিক বিকারগ্রস্ততা দেখা গেছে। খুন করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। হেলাল উদ্দিন আরও জানান, সম্রাট তার প্রকৃত নাম নয়; নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে তিনি ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তার বাবার নাম পান্না শেখ। মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোসামান্দা গ্রামে তার জন্মস্থান এবং পৈতৃক নিবাস। তারা মোট সাত ভাইবোন – তিন ভাই ও চার বোন। তাদের নানাবাড়ি বরিশাল জেলায় অবস্থিত।
পুলিশের ধারণা, সম্রাট সম্ভবত অন্য কোনো অপরাধ করে সাভারে এসে ভবঘুরে জীবন ধারণ করেছেন। শিগগিরই তার সম্পূর্ণ পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব হবে। তিনি সাভারে বেশিরভাগ সময় সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকার মডেল মসজিদে রাত কাটাতেন। ২০১৫ সালের ৪ জুলাই আসমা বেগম নামে এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর তিনি সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে আস্তানা গাড়েন। এরপর থেকে ওই কমিউনিটি সেন্টার থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হতে থাকে। গত পাঁচ মাসে ওই ভবন থেকে মোট পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
হেলাল উদ্দিন আরও জানান, পুলিশের নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবে গত শুক্রবার রাতে কমিউনিটি সেন্টার পরিদর্শনে গিয়ে সম্রাটের বিছানায় এক কিশোরীকে শুয়ে থাকতে দেখা যায়, যেখানে সম্রাট পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ওই কিশোরী সম্রাটকে তার ভাই পরিচয় দিয়ে তিন দিন আগে কমিউনিটি সেন্টারে আসার কথা জানায়। পরদিন শনিবার রাতে সম্রাট ওই কিশোরীসহ দুজনকে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলেন। রোববার দুপুরে তাদের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে সম্রাটের জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর রোববার সন্ধ্যায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি ছয়টি খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
সম্রাট দিনের বেলায় থানার আশেপাশে ঘোরাফেরা করলেও রাতের বেলায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক বা পদচারী-সেতুতে তার আনাগোনা ছিল। তিনি রাতে পদচারী-সেতুতে ঘুমানো ভবঘুরে নারীদের প্রলোভন দিয়ে পৌর কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে আসতেন, এবং যারা তার কথায় সাড়া দিত, তারাই হত্যাকাণ্ডের শিকার হতেন। পুলিশের দাবি, নিজের পরিচয় গোপন করে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ভবঘুরে নারীদের নির্জন স্থানে নিয়ে আসতেন সম্রাট। তবে ওই নারীরা যদি অন্য কারো সঙ্গে অনৈতিক কাজ করত, তাহলে সম্রাট তাদের হত্যা করত। সর্বশেষ ঘটনায়, তানিয়া ওরফে সোনিয়া নামের এক ভবঘুরে তরুণীকে কমিউনিটি সেন্টারে নিয়ে আসার ৩-৪ দিন পর তার সঙ্গে অন্য এক ভবঘুরে যুবক অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলে সম্রাট প্রথমে ওই যুবককে কমিউনিটি সেন্টারের দোতলায় নিয়ে হত্যা করেন। এরপর ওই তরুণীকে নিচতলায় হত্যা করে মরদেহ দু’টি পুড়িয়ে দেন।
সাভার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী নিশ্চিত করেছেন যে, খুনি ধরা পড়েছেন এবং খুনের দায় স্বীকার করেছেন। বর্তমানে নিহতদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে। তিনি আরও যোগ করেন, সম্রাট এই ছয় খুন ছাড়াও অন্য কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন, যা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

