ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি এমন এক ক্রান্তিকালে দেশের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেছেন, যখন বাংলাদেশ একাধিক গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৮ মাসের বিশৃঙ্খল শাসনের অবসান, এক শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন—এগুলো তার সামনে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
তবে তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের ধীরগতি অর্থনীতিতে নতুন করে গতি সঞ্চার করা। কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল জিডিপি, ঊর্ধ্বমুখী রপ্তানি, দারিদ্র্য নিরসন এবং মাথাপিছু আয়ের উন্নতি দেশটিকে ‘এশিয়ান টাইগার’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছিল। তবে গত দুই বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে: মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশে নেমে এসেছে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমান এই সংকট উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তিনি অভ্যন্তরীণ সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার পাশাপাশি অর্থনীতিকে চাঙ্গা করাকে তার প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। দেশের অস্থির পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে তার এই বিশেষ গুরুত্বারোপ অত্যন্ত অপরিহার্য।
তার নির্বাচনী প্রচারে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি দ্বিগুণ করা, লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
যদিও এ উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতি পূরণের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনো প্রকাশিত হয়নি—উদাহরণস্বরূপ, ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতি দ্বিগুণ করতে বার্ষিক ৯ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা বর্তমান প্রবৃদ্ধির হারের দ্বিগুণেরও বেশি। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অর্থনৈতিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। এ প্রেক্ষাপটে ঢাকা ‘আসিয়ান’-এর সদস্যপদ গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এই কৌশল প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে এবং বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের সম্পর্ককে স্থিতিশীলতা দেবে। বাংলাদেশের বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর সঙ্গে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীকে নিশ্চিত করতে হবে যে একই নীতি তার অভ্যন্তরীণ প্রশাসনকেও পরিচালিত করবে। বিনিয়োগকারীরা—তাঁরা দেশীয় বা আন্তর্জাতিক যাই হোন—অস্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সংঘাত বা সামাজিক উত্তেজনার মতো বিষয়গুলো পছন্দ করে না।
শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল কর্মসংস্থান নিয়ে জনদুর্ভাবনা থেকে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন পাওয়ায় তারেক রহমানের সামনে এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি করার মতো পরিবর্তনের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। শেষ পর্যন্ত, এই ধরনের সংস্কারই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি।
