অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেছেন যে, বর্তমান সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দলনিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকে। এ সময় নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করা ছাড়া আমাদের অন্য কোনো কাজ থাকে না। তবে, গণভোটের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান নিরপেক্ষ নয়। আমরা চাই ২১ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাগুলো গণমানুষের দ্বারা সমর্থিত হোক। মানুষের আন্দোলনের মাধ্যমে এই জুলাই অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে, তাই মানুষের দ্বারাই এটি আইনগতভাবে সমর্থিত হওয়া প্রয়োজন। এ কারণে আমরা একটি পক্ষ এবং ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয়যুক্ত হওয়া কামনা করি।

২০ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) বিকেল ৪:৩০ মিনিটে নওগাঁ সদর উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে জেলা প্রশাসন আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। এই সভায় গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশে সম্পন্ন করা এবং ভোটারদের মধ্যে গণভোটের বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার আরও বলেন, প্রায়শই একটি প্রশ্ন ওঠে যে কেন সরকার ভোটের প্রচারে নামছে এবং এতে সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুন্ন হচ্ছে কিনা। এর উত্তরে আমি বলতে চাই, আমাদের এই সরকার বিশেষ ধরনের সরকার। এটি ‘২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফসল। ফলে সেই গণঅভ্যুত্থানে মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছার প্রকাশ ঘটেছে, তা বাস্তবায়ন করা এই সরকারের দায়িত্ব। সরকার সংস্কার করছে, বিচার করছে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, আমরা অনেক নতুন আইন অধ্যাদেশ আকারে গ্রহণ করেছি, যা সংস্কারের অংশ। এই আইনগুলো পরবর্তী জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আবশ্যক। যদি তা না হয়, তাহলে এই পরিবর্তনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। সংস্কারের জন্য সংবিধানেও কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন, যা অনেক সময় আদেশের মাধ্যমে করা যায় না। এ জন্য সবার সম্মতির প্রয়োজন পড়ে এবং এটিও পরবর্তী সংসদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াবে। যে সমস্ত রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তারা সকলেই গণঅভ্যুত্থানের অংশ। এরপরও আমরা কেন ভোটের প্রচারে নামছি? গণঅভ্যুত্থানে মানুষের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ এবং ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা, এইগুলোই ছিল আন্দোলনের সময় মানুষের মূল চাওয়া।

অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, এক শতাব্দীর বেশি সময় পার হয়ে গেলেও গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, যার কারণে দেশের মানুষকে বারবার রক্ত দিতে হয়েছে। ‘২৪ সালের আগে ‘৯০-এর দশকে একটি বড় আন্দোলন হয়েছিল। সেই সময় আন্দোলনকারী জোটগুলো একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছিল এবং দলিলে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো সেই পথে আগায়নি এবং তা বাস্তবায়ন করেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। ২১ জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং এর মাধ্যমে প্রকাশিত আকাঙ্ক্ষাগুলো যদি টেকসই করতে হয়, তাহলে কেবল একটি দলিল আকারে জুলাই সনদ রেখে গেলে এর বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ দেখা দিতে পারে। তাই এর প্রতিকার হতে পারে গণমানুষের সমর্থন আদায় করা। আমরা যদি জনগণের সমর্থন আদায় করতে পারি, তাহলে নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তারা এই আকাঙ্ক্ষাগুলো বাস্তবায়ন করতে বাধ্য থাকবেন। এই যুক্তি থেকেই গণভোটের ধারণার উৎপত্তি।

তিনি আরও বলেন, যারা নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তাদের প্রতি আমার বক্তব্য হলো, আপনাদের নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন। আমি মনে করি এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি আপনার শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস। আপনি নিরপেক্ষ থাকলে আপনার বিরুদ্ধে অনেকে অপপ্রচার চালালেও তারা মনে মনে জানবেন যে আপনি নিরপেক্ষ। যারা নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত, আপনারা কোনো দলের সমর্থক হতে পারেন, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু যখন আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করছেন এবং নির্বাচন পরিচালনা করছেন, সে ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই নিরপেক্ষ থাকতে হবে। সামগ্রিক প্রশাসন সর্বদা সতর্ক থাকবে যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে। মানুষ যেন নির্ভয়ে এবং নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে পারে। যদি আমরা এই অবস্থা তৈরি করতে পারি, তাহলে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে এবং নির্বিঘ্নে ভোট দেবে।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বক্তব্য রাখেন।

Exit mobile version